আপনি যদি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস জানতে চান, তাহলে একটি প্রশ্ন প্রায়ই সামনে আসে—অসহযোগ আন্দোলন কী? এটি ছিল এমন একটি গণআন্দোলন যা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অহিংসভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্দোলন ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে একটি সুশৃঙ্খল ও জনসমর্থিত প্রতিক্রিয়া ছিল। এর লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ভারতীয়দের দাবি মানিয়ে নেওয়া।
এই আন্দোলন শুরু হয়েছিল এমন এক সময়ে যখন ভারতীয়রা ব্রিটিশ শাসনের প্রতি ব্যাপকভাবে ক্ষুব্ধ ছিল। রাওলাট আইন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড এবং খেলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপট এই ক্ষোভকে আরও তীব্র করে তোলে। এই পটভূমিতেই মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন এবং ভারতীয় জনসাধারণ তাতে সক্রিয়ভাবে সাড়া দেয়।
এই প্রবন্ধে আপনি বিস্তারিতভাবে জানতে পারবেন অসহযোগ আন্দোলন কী, কেন এটি শুরু হয়েছিল, কী ছিল এর কৌশল, এবং এই আন্দোলনের পরিণতি কী ছিল। ইতিহাসে এই আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যা ভবিষ্যৎ স্বাধীনতা আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে তোলে।
অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা ও প্রেক্ষাপট

যখন আপনি জানতে চান অসহযোগ আন্দোলন কী, তখন এর সূচনা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বুঝে নেওয়া জরুরি। ১৯১৯ সালে ব্রিটিশ সরকার “রাওলাট আইন” প্রণয়ন করে, যার মাধ্যমে সরকার যেকোনো ভারতীয়কে বিচার ছাড়াই আটক করতে পারতো। এই আইন ভারতীয়দের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এরপর ঘটে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড—১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল, ব্রিটিশ সেনাপতি জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে নিরস্ত্র জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হয়, যাতে শতাধিক লোক নিহত হন।
এই ঘটনার পর ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ভারতের জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ জন্ম নেয়। একইসঙ্গে, মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে খেলাফত আন্দোলনের কারণে একটা বড়ো অস্থিরতা দেখা দেয়। মুসলমানরা উসমানীয় খেলাফত ব্যবস্থাকে সমর্থন করছিলেন, কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ব্রিটিশরা তুরস্কের খেলাফত বাতিল করে দেয়। এই ঘটনা মুসলিমদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করে।
এই দুটি ধারাকে একত্রিত করে মহাত্মা গান্ধী জাতীয় স্তরে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। তিনি মনে করেন, ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রতি সব ধরনের সহযোগিতা বন্ধ করলেই সরকার চাপে পড়বে এবং তাদের অন্যায় শাসন বন্ধ করতে বাধ্য হবে।
এইভাবেই অসহযোগ আন্দোলনের সূচনা হয়। এটি ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত যেখানে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায় প্রথমবারের মতো একটি অভিন্ন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে একত্রিত হয়।
আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ও কৌশল

অসহযোগ আন্দোলন কী প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে এর উদ্দেশ্য ও কৌশল জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতীয়দের নির্ভরতাকে পুরোপুরি অস্বীকার করা। তবে, এটি কোনো সহিংস আন্দোলন ছিল না। বরং গান্ধীর “অহিংসা” নীতির ভিত্তিতে, এই আন্দোলনের কৌশল ছিল শান্তিপূর্ণভাবে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কৌশল ছিল সরকারি চাকরি, উপাধি ও সম্মান বর্জন করা। বহু ভারতীয় শিক্ষিত ব্যক্তি ব্রিটিশ প্রশাসনের উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন। গান্ধীজির আহ্বানে তারা সেই পদ থেকে পদত্যাগ করেন। অনেকে তাদের “কাইসার-ই-হিন্দ” জাতীয় সম্মান ফিরিয়ে দেন।
আরেকটি কৌশল ছিল বিদেশি পণ্য বর্জন এবং স্বদেশি পণ্যের ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান। ব্রিটিশ তৈরি কাপড় পোড়ানো, ইংরেজি স্কুল ও আদালত বর্জন করাও ছিল আন্দোলনের কৌশলের অংশ। জনগণ খদ্দরের কাপড় পরা শুরু করে এবং দেশীয় শিল্প ও কারিগরদের উৎসাহ দেয়।
এইসব কৌশলের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনকে বোঝানো যে ভারতীয়রা যদি চায়, তাহলে তারা স্বনির্ভর হতে পারে। তারা শাসন ও প্রশাসন চালাতে সক্ষম এবং বিদেশি শাসনের প্রয়োজন নেই।
অতএব, আপনি যখন জানতে চান অসহযোগ আন্দোলন কী, তখন এটিকে কেবল প্রতিবাদের একটি রূপ নয়, বরং আত্মসম্মান ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত।
আন্দোলনের বিস্তার ও জনগণের অংশগ্রহণ
আপনি যদি ভাবেন এই আন্দোলনে কেবল শহরের শিক্ষিত মানুষরাই অংশগ্রহণ করেছিলেন, তাহলে ভুল করবেন। অসহযোগ আন্দোলন গ্রামের সাধারণ কৃষক থেকে শুরু করে মজুর, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী—সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। আন্দোলনের ব্যাপকতা এতটাই ছিল যে ভারতের প্রায় প্রতিটি প্রদেশ এতে কোনো না কোনোভাবে অংশগ্রহণ করেছিল।
শহরাঞ্চলে ইংরেজি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আদালতের বর্জন, বিদেশি পণ্যের প্রতিরোধ এবং সভা-সমিতির মাধ্যমে প্রতিবাদ সংগঠিত হয়। অপরদিকে, গ্রামাঞ্চলে কৃষকেরা খাজনা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, জায়গায় জায়গায় সভা করে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো হয়।
নারীরাও এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। তাঁরা স্বদেশি কাপড় বুনতে শুরু করেন, প্রতিবাদ সভায় যোগ দেন এবং অন্য নারীদের অংশগ্রহণে উৎসাহিত করেন। এটি নারীর সামাজিক জাগরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এই গণআন্দোলনে শিক্ষার্থীরাও পিছিয়ে ছিল না। হাজার হাজার ছাত্র ব্রিটিশ পরিচালিত স্কুল, কলেজ ছেড়ে দিয়ে জাতীয় বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এটি ভারতীয় শিক্ষার ইতিহাসে এক বড় পরিবর্তনের সূচনা করে।
সার্বিকভাবে এই আন্দোলন ভারতের জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়ে তোলে। মানুষ বুঝতে পারে তারা একসঙ্গে হলে বড়ো থেকে বড়ো শক্তিকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। এটি ছিল ভারতের ইতিহাসে একটি ঐক্যবদ্ধ শক্তির বিস্ফোরণ।
আন্দোলনের সমাপ্তি ও পরিণতি
যদিও অসহযোগ আন্দোলন খুব দ্রুত জনগণের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে, কিন্তু ১৯২২ সালের একটি ঘটনা আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। উত্তরপ্রদেশের চৌরি-চৌরা নামক স্থানে এক বিক্ষোভ চলাকালীন উত্তেজিত জনতা একটি থানায় আগুন ধরিয়ে দেয়, এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এই সহিংস ঘটনায় গান্ধীজী অত্যন্ত মর্মাহত হন এবং ঘোষণা দেন—আন্দোলন তখনই সফল হতে পারে যখন তা সম্পূর্ণ অহিংস থাকবে।
ফলে, গান্ধীজি সেই বছরের ফেব্রুয়ারিতে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। এই সিদ্ধান্তে অনেকেই হতাশ হয়েছিলেন, কারণ আন্দোলন তখন তুঙ্গে ছিল এবং সরকারও কিছুটা চাপে পড়েছিল। তবে গান্ধীজির নৈতিক অবস্থান ছিল পরিষ্কার—সহিংস পথে নয়, বরং নৈতিক শক্তির মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে।
অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করা হলেও, এটি ভারতীয় রাজনীতিতে একটি বড় প্রভাব ফেলে। এই আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা বৃদ্ধি পায়। অসহযোগ আন্দোলন কী এই প্রশ্নের উত্তর আপনি যদি এক লাইনে দিতে চান, তাহলে বলা যায়—এটি ছিল একটি অহিংস, সংগঠিত গণআন্দোলন যা ভবিষ্যৎ স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত গড়ে দিয়েছিল।
অসহযোগ আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা
আপনি যদি জানতে চান অসহযোগ আন্দোলন কী, তাহলে নারীদের অবদান কখনোই উপেক্ষা করা যায় না। এই আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতীয় নারীরা প্রথমবারের মতো বৃহৎ পরিসরে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণ করে। আগে নারীরা সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকলেও, অসহযোগ আন্দোলন তাদের জন্য একটি নতুন দরজা খুলে দেয়।
নারীরা স্বদেশি পণ্য তৈরি, খদ্দরের কাপড় বোনা, সভা-সমিতিতে বক্তৃতা দেওয়া এবং প্রতিবাদ মিছিলে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আন্দোলনের মূল ধারার সঙ্গে যুক্ত হন। বোম্বে, কলকাতা, মাদ্রাজসহ বিভিন্ন শহরের নারী সমাজ বিদেশি কাপড় পোড়ানো ও বিদেশি জিনিস বর্জনের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী বার্তা দেন।
সারোজিনী নাইডু, কল্পনা দত্ত, মীরা বেন প্রমুখ নারীরা এই সময়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সরব হন এবং অনেকেই গ্রেফতার পর্যন্ত হন। অনেক সাধারণ গৃহিণীও ঘর ছেড়ে প্রতিবাদ সভায় অংশ নেন, যা সমাজে নারীর মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে।
এই নারীকেন্দ্রিক অংশগ্রহণের ফলে অসহযোগ আন্দোলন আরও বিস্তৃত ও গণমুখী হয়ে ওঠে। তাই আপনি যখন অসহযোগ আন্দোলন কী বোঝার চেষ্টা করেন, তখন নারীদের ভূমিকা একটি অবিচ্ছেদ্য অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এটি ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে নারীর প্রথম বৃহৎ জাগরণের দৃষ্টান্ত হিসেবেও স্মরণীয়।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী
অসহযোগ আন্দোলন কী?
অসহযোগ আন্দোলন কী—এটি ছিল মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত এক অহিংস রাজনৈতিক আন্দোলন, যার লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ প্রশাসনের প্রতি ভারতের সহযোগিতা বন্ধ করা।
অসহযোগ আন্দোলনের প্রধান কারণ কী ছিল?
রাওলাট আইন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড এবং খেলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। এটি ছিল ব্রিটিশ সরকারের অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে একটি সাংগঠনিক প্রতিক্রিয়া।
অসহযোগ আন্দোলনের প্রধান কৌশল কী ছিল?
সরকারি চাকরি, পদবি ও সম্মান বর্জন, বিদেশি পণ্য বর্জন, স্বদেশি ব্যবহারে উৎসাহ, ব্রিটিশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ত্যাগ এবং স্থানীয় পণ্যের প্রচার ছিল এর মূল কৌশল।
অসহযোগ আন্দোলনের সমাপ্তি কেন হয়?
১৯২২ সালে চৌরি-চৌরা ঘটনার পর গান্ধীজী মনে করেন আন্দোলন সহিংস হয়ে পড়ছে, তাই তিনি তা প্রত্যাহার করে নেন।
এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ প্রভাব কী ছিল?
এটি ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়ে তোলে এবং পরবর্তী স্বাধীনতা আন্দোলনগুলোর জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে।
উপসংহার
আপনি যদি আজ প্রশ্ন করেন অসহযোগ আন্দোলন কী, তবে এটিকে কেবল একটি ইতিহাসের পৃষ্ঠা ভাববেন না। এটি ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক যুগান্তকারী অধ্যায়, যেখানে অহিংস পথে শাসকের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়েছিল।
এই আন্দোলনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ প্রথমবারের মতো ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে একত্রিত হয় এবং বুঝতে পারে যে নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য গণশক্তির প্রয়োজন। যদিও কিছু সীমাবদ্ধতা ও বাধা ছিল, তবুও এর সাংগঠনিক দিক, নৈতিকতা ও জনগণের জড়িত থাকার মাত্রা ভারতীয় ইতিহাসে অনন্য।
এই আন্দোলন কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং সামাজিক জাগরণ, নারীর অংশগ্রহণ, শিক্ষার বিকল্প চিন্তা ও অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার ধারণাকেও সামনে নিয়ে আসে। তাই অসহযোগ আন্দোলন কী এই প্রশ্নের উত্তর শুধু অতীত নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্যও এক শিক্ষণীয় অনুপ্রেরণা।










